ফিরোজ শাহের নির্বাচিত বিশ কবিতা



প্রেম

শাদা চক

ব্ল্যাকবোর্ডের শরীরে ঠোঁট ঘষতে ঘষতে

 

লিখে রাখে মৃত্যুর খতিয়ান।

 

ঘুণপোকা

তোমার মন ব্যস্ত ঘুনপোকা 

বাহিরে ঠিকঠাক ভেতরে কেবল কেটেই চলেছো।

 

কাঠ থেকে কাঠেই তোমার গমণ  !

 

মার্বেল

ছুটে যাচ্ছে তিনটা মার্বেল

 

সবুজ মার্বেল বন হচ্ছে

সাদা মার্বেল আকাশ হচ্ছে

 

নীল মার্বেলটা ঘুরে ঘুরে ঢুকে যাচ্ছে আমার ভেতরে। 

 

সংহার

দেয়ালঘড়ির

 

ভেতরে বাস করে তিনজন

ক্রমিক সঙ্গমে প্রেগন্যান্ট ঘন্টার কাঁটা

 

প্রসবের পর 

বৃত্তঘর থেকে বেরিয়ে এসে

 

চারজনে 

ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে সূর্যের পোড়া মাংস।

 

সমুদ্র

বাটিতে করে

সমুদ্র নিয়ে আসি ঘরে

 

লাফ দেয় ইলিশমাছ

বটি দিয়ে মাছ কাটতে গিয়ে দেখি-

 

সমুদ্রটা

মাঝ বরাবর দুভাগ হয়ে যাচ্ছে...

 

ফুলস্টপ

ফুলস্টপে

দাঁড়িয়েছিলাম অনেকদিন

 

চারপাশ দেখে

মাছের খোঁজে

 

মাছরাঙ্গার মত ডুব দিয়ে

শূন্য ঠোঁটে

 

উড়ে যাচ্ছি আকাশে

তীরভাঙা ঢেলার মতো জলে পড়ে যাচ্ছে ফুলস্টপ ।

 

জংশন

বরফ কেটে বানানো কুকুর

বিষদাঁত জমা রেখে

লাফিয়ে পড়ে জলের জংশনে  

সমুদ্রের ট্রেন মিস করে

 

জোছনার তাড়া খেয়ে চলে আসে চাঁদের কাছে।

 

ঐশ্বর্য

পাতিলে

আলু মুলা শিম আর কাতলমাছের

আগুনবাস শেষে 

একটা সুস্বাদু সালুন

ঘরময় দৌড়াদৌড়ি করে ঘ্রাণ

 

রান্নার শেষের দিকে আসে ধনেপাতা

 

সালুনের ঘ্রাণ খেয়ে 

ছড়িয়ে দেয় নিজের ঘ্রাণ।

 

জামগাছ

জামগাছে

ধরে আছে গোল গোল অন্ধকার

 

টুপটুপ ঝরে পড়লে 

রাত আসে পুকুরে

 

মাছেদের ঘুম পাড়িয়ে  উড়ে যায় জামগাছ। 

 

ব্রহ্মাণ্ড

প্লেটে

দুধ কলা ভাত

কিছুক্ষণ পর জেগে ওঠলো তিনজন

 

একটি গরু

ধানগাছ খেয়ে চলে যাচ্ছে কলাগাছের দিকে।

 

পেঁয়াজ

পেঁয়াজের

প্রথম শাড়িটা রংচটা

দ্বিতীয় শাড়িটা খুললে 

চোখে ঝাঁঝ আসে

 

ক্রমিক শাড়ি খোলা শেষে মুছে যায় দ্রাঘিমারেখায়।

 

অচেনা ছায়া

রোদ্দুর চুম্বনদৃশ্যে 

মৃত ছায়াগুলি

বিড়ালছানার মতো পালিয়ে গেল অন্ধকারে

 

ছায়ার সন্ধানে মসলার বন উজাড়

জীবনভর সাথে থেকেও

কালিজিরা রাতের গহিনে এক অচেনা ছায়া।

 

আগুন 

কাঠ পোড়ানোর পরে আগুনেরও মৃত্যু হয়।   

 

জল

চোখের মৃত্যু হলেও

জলের মৃত্যু হয় না

 

ধীরপায়ে হাঁটে কষ্টের রাস্তায়।

 

 

নদীর এপিটাফ

কাগজের ওপরে নদী আঁকতে আঁকতে 

হঠাৎ জল এসে ভিজিয়ে দেয় আমাকে

 

কি গভীর স্রোত 

ঝাঁপ দিই নদীতে

স্রোতে ধেয়ে আসা মাছেদের তাড়া খেয়ে হাঁটি নদীর তলদেশে

উপরে ভাসমান নৌকাগুলো জোনাকি হয়ে উড়ে

 

কাগজ ছিঁড়ে গেলে মরে যায় নদী

এবং আমি    

আমার সমাধিতে ঝুলে থাকে নদীর এপিটাফ।  

 

মানুষ

মানুষ নিজেই একটি বিয়োগচিহ্ন

ট্রেনের বগির মতো

জোড়া লেগে পালিয়ে যাচ্ছে স্টেশন থেকে... 

 

দেবদারুগাছ

নদীর পাশে

একটা দেবদারুগাছ

দেখতে দেখতে

নদীর ছায়াটি উঠে আসে দেহে

লুকিয়ে রাখে অনেকদিন

 

রাত হলে

হেঁটে যায় দূর গ্রামে

 

মা গাছটির কাছে এলে 

ঢেলে দেয় আস্ত একটা নদী।

 

আনন্দবৃক্ষ

পয়সার

ভেতরে একটি আনন্দবৃক্ষ

 

প্রতিবার

হাত বদলে

একটি করে ফুল ফুটে

ছড়িয়ে পড়ে শাদা ঘ্রাণ।  

 

উত্তরাধিকার

বাবার প্লেটে আলুভর্তার পাশে আস্ত একটা চাঁদ

জোছনা খেতে খেতে বাবা একদিন জোনাকি হয়ে যায়

 

পোড়ামরিচের অন্ধকারে দৌড়ে 

আয়ুরেখা অতিক্রম করেছিল মা

 

পান্তাভাত আর কাঁচামরিচের পাশে উৎপন্ন শীতকাল

আমার উত্তরাধিকার। 

 

মায়া

রেললাইন থেকে 

একটি পাথর নিয়ে আসি ঘরে

ট্রেনের শব্দ পেয়ে 

পাথরটি 

দরজা খুলে চলে যাচ্ছে রেললাইনে । 

 

ফিরোজ শাহ জন্ম ১ জুলাই, ১৯৮৭, সুবর্ণচর, নোয়াখালী মা-ফাতেমা খাতুন, বাবা-মোঃ নুরুল হক কর্মজীবনে তিনি একজন শিক্ষক প্রকাশিত বইউজানে সোনালি মাছ (২০১৭), ব্ল্যাকবোর্ডে নুনগাছ (২০২০), মানুষ নিজেই একটি বিয়োগচিহ্ন (২০২১) 

Post a Comment

10 Comments

  1. ভালো কবিতা

    ReplyDelete
  2. সবগুলোই ভালো। উত্তরাধিকারটা বেশি ভালো

    ReplyDelete
  3. ফিরোজ শাহSeptember 11, 2022 at 6:06 PM

    ধন্যবাদ।

    ReplyDelete
  4. ঘুনপোকা,সমুদ্র, মায়া সংহার সহ বাকি কবিতাগুলোও ভালো লেগেছে।

    ReplyDelete
  5. খুব ভালো লাগলো

    ReplyDelete
  6. এক একটি ছবি। চেনা জানা।সব মিলিয়ে সুন্দর রহস্যময়। নিখুঁত কোলাজ। ___যযাতি দেবল।

    ReplyDelete
  7. একসঙ্গে কুড়ি!যেন অনেকগুলো কবিতার কুঁড়ি। প্রতিটি কবিতায় অদ্ভুত মায়া; ভালবাসার মায়া কাজল। কলমের আঁচড়ে নিখুঁত মায়াছবি। পড়ার পর চুপ করে বসে থাকতে হয়। কবিতার অন্তর্গত শ্লোক এসে জড়িয়ে দেয় কাহিনীর মায়া চাদর। অভিনন্দন কবিকে।—যযাতি দেবল

    ReplyDelete