শুক্লপক্ষ নির্বাচিত রফিক আজাদের দশ কবিতা



স্মৃতিচাঁদের মতো ঘড়ি


ঘড়ির কাঁটায় স্থিরসমর্পিতহে আমার অন্তরঙ্গ অবিচ্ছিন্ন চাঁদ,
তোমার যাদুতে মুগ্ধ এই আমি শতচ্ছিন্ন কাঁথার একায়
হিরন্ময় নক্ষত্রের মেলা এক বসিয়েছি অবাস্তব স্বপ্নের বিন্যাসে:
একটা বয়স আছে অবোধ শিশুর দল শতাধিক পুতুলে যখন
জননীর মতো সোহাগ বিলোতে চায়,—
ন্যাকড়ার টুকরোয় তারা কী উজ্জ্বল জামা তৈরি করে,
চুমোয় আচ্ছন্ন করে সারি-সারি পুতুলের নির্বিকার মুখ!
শিশুদের মতো আমি,— মুখাবয়বসর্বস্ব,—ভাঙা এই একটি পুতুলে
আমারও আজন্ম খেলাসারাবেলাদুপুরে-রাত্রিতে

ঘড়ির কাঁটায় স্থিরসমর্পিতহে আমার অন্তরঙ্গ অলীক লন্ঠন,
সর্বক্ষণ জ্বলে যাও তুমিতোমার মুখশ্রীখানি
কী মসৃণ আলো ফ্যালে দুর্গন্ধে আমার!
অবাস্তব উটপাখিতোমার পিঠের পরে চড়ে
জরায়ুতে চলে যাইভবিষ্যতে যাই
খটখটে মৃত্তিকায় শিকড় চারিয়ে দিইকিংবা
আইয়ো-র শিঙয়ের মতো বাঁকানো শৈশব ঘুরে আসি!
শিখাহীন অলৌকিক তোমার আগুনে পুড়ে যায়
পরিত্যক্ত বাঁশঝাড়গাছপালাগোপন বাগান!

ঘড়ির কাঁটায় স্থিরসমর্পিতহে আমার অন্তরঙ্গ জীবনদেবতা,
তালের শাঁসের মতো রাতে আনো অপার বেদনা;
সাবানের মতো তুমি পিছলিয়ে যাও
ব্যক্তিগত বাথরুম থেকে কোথা কোন্ স্বর্গলোকে!
আমার বাস্তব-স্বপ্নে কখনো আসো না আর ফিরে

তবে অশ্রুজল ছাড়া ঐ-পদপল্লবে
আর কী দেবার আছে? …কেবল চোখের জলে ভরে দিতে পারি
একটু অদৃশ্যশুষ্ক বঙ্গোপসাগর।

 

বালক ভুল করে নেমেছে ভুল জলে

বালক জানে না তো পুষবে অনুরাগ
হৃদয়ে কতদিনকার বা চলা-পথে
ছড়াবে মুঠো-মুঠো বকুল ফুলগুলো;
কোথায় যেতে হবেযাবে না কোন দিকে,
ব্যাপক হাঁটাহাঁটি করবে কোন পথে!

বালক জানলো নামানুষ ম্লানমুখে
কেন যে তারা গোনেপায়ের নীচে কার
কেন যে ফুল ঝরেকতটা ফুল ঝরে!
মানুষ ভুল পথে গিয়েছে কত দূর,
বেপথু কাকে বলে বালক জানে না তা!

বালক জানে না তো কতটা হেঁটে এলে
ফেরার পথ নেইথাকে নানিরুপায়
যে আসে সে-ই জানেভুলের দামে কিনে
আনে সে প্রিয় ম্যাপপথিক ম্রিয়মাণ,
উল্টোরথে চড়ে চলেছে মূল পথ!

বালক জানে না তো অর্থনীতি আর
মৌল রাজনীতিউল্টো করে ধরে
সঠিক পতাকাটিপতাকা দশদিশে
যেনবা কম্পাস স্বদেশ ঠিক রাখে

বালক জানে না সে বানানে ভুল করে
উল্টাসিধা বোঝে : সঠিক পথজুড়ে
পথের সবখানে কাঁটার ব্যাপকতা!
বালক ভুল করে পড়েছে ভুল বই,
পড়ে নি ব্যাকরণপড়ে নি মূল বই!
বালক জানে না তো সময় প্রতিকূল,
সাঁতার না শিখে সে সাগরে ঝাঁপ দ্যায়,
জলের চোরাস্রোত গোপনে বয়ে যায়,
বালক ভুল করে নেমেছে ভুল জলে!

বালক জানে না তো জীবন থেকে তার
কতটা অপচয় শিল্পে প্রয়োজন

পাথর বেশ ভারীবহনে অপারগ
বালক বোঝে না তাবালক সিসিফাস
পাহাড়ে উঠে যাবেপাথর নেমে যাবে
পাথুরে পাদদেশে!বিমূঢ়বিস্মিত
বালক হতাশায় অর্তনাদ করে
গড়িয়ে পড়ে যাবে অন্ধকার খাদে

বালক জানে না তো সময় প্রতিকূল,
ফুলের নামে কত কাঁটারা জেগে থাকে
পুরোটা পথজুড়েদীর্ঘ পথজুড়ে
বালক জানে না তাবালক জানে না তো!
বালক জানে না তো কতটা হেঁটে এলে
ফেরার পথ নেইথাকে না কোনো কালে।
 

 

যদি ভালোবাসা পাই

যদি ভালোবাসা পাই……….. আবার শুধরে নেব
………………… জীবনের ভুলগুলি
যদি ভালোবাসা পাই
……….. ব্যাপক দীর্ঘপথে
………………… তুলে নেব ঝোলাঝুলি
যদি ভালোবাসা পাই
……….. শীতের রাতের শেষে
………………… মখমল দিন পাবো
যদি ভালোবাসা পাই
……….. পাহাড় ডিঙাবো আর
………………… সমুদ্র সাঁতরাবো
যদি ভালোবাসা পাই
……….. আমার আকাশ হবে
………………… দ্রুত শরতের নীল
যদি ভালোবাসা পাই
……….. জীবনে আমিও পাব
………………… মধ্য- অন্তমিল
যদি ভালোবাসা পাই
……….. আবার শুধরে নেব
………………… জীবনের ভুলগুলি
যদি ভালোবাসা পাই
……….. শিল্পদীর্ঘপথে
………………… বয়ে যাবো কাঁথাগুলি

 

 

মাধবী এসেই বলে: যাই

খণ্ডিত ব্রিজের মতো নত মুখে তোমার প্রতিই
নীরবে দাঁড়িয়ে আছি: আমার অন্ধতা ছাড়া আর
কিছুই পারি নি দিতে ভীষণ তোমার প্রয়োজনে;
উপেক্ষা করো না তবুরানীতোমার অনুপস্থিতি
করুণ বেদনাময়বড় বেশি মারাত্মক বাজে
বুকের ভিতরে কী যে ক্রন্দনের মত্ত কলরোলে

দালি-র দুঃস্বপ্নে তুমিআর্তো-র উন্মাদ মনোভূমে,
সবুজ মৎস্যের মতো অবচেতনের অবতলে
রঙিন শ্যাওলা-ঝাড়ে সুজাতার মতো সরলতা

মুহূর্তের নীলিমায় তরুণ ধ্যানীর মনে হয়
তুমি হও ছলাকলাহীনরূপশালী ধান-ভানা
জীবনানন্দের মনোবাঙলার এক শাদাসিধে
নেহাৎ রূপসী। তবু কেন প্রাণপাত পরিশ্রমে
তোমাকে যায় না পাওয়া?—তুমি নেই মস্তিষ্কেহৃদয়ে

কখনো জ্যুরিখে তুমিকিয়োটোতেবাম-তীরে,
গ্রীনিচ পল্লীতে কিংবা রোমে পড়ে থাকোকখনোবা
যোগ দাও পোর্ট-সৈয়দের নোংরা বেলাল্লাপনায়

তোমার স্বভাব নয় স্থিরতায়অস্থিরঅধীর
তুমি আছ অনুভবেতুমি আছ শিশুর স্বভাবে

ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পরিশ্রমে গড়ে-ওঠা রম্য-
অট্টালিকাস্বভাবের ডালপালাবিশ্ব-চরাচর

যেনবা কোথাও গর্জে ওঠে ভয়াবহ অগ্নিগিরি
সোনালি লাভার স্রোতে ভরে দিল গ্রাম ও নগর

যেন গর্ভগৃহ থেকে নেমে ডিনামাইটের মতো
অসম্ভব তোলপাড় তুলে দিল একটি শৈশব

অবিশ্বাস্য উষ্ণতায়চাপে দ্রুত গলে যেতে থাকে
ঘড়ির ডায়াল আর তোমার নিটোল অবয়ব

তুমি সেই লোকশ্রুত পুরাতন অবাস্তব পাখি,
সোনালি নিবিড় ডানা ঝাপটালে ঝরে পড়ে যার
চতুর্দিকে আনন্দটাকার থলিভীষণ সৌরভ!

রোমশ বালুকা-বেলা খেলা করে রৌদ্রদগ্ধ তটে
অস্তিত্বের দূরতম দ্বীপে এই দুঃসহ নির্জনে
কেবল তোমার জন্যে বসে আছি উন্মুখ আগ্রহে

সুন্দর সাম্পানে চড়ে মাধবী এসেই বলে—‘যাই 

 

ভাত দে হারামজাদা

ভীষণ ক্ষুধার্ত আছি: উদরেশরীরবৃত্ত ব্যেপে
অনুভূত হতে থাকেপ্রতিপলেসর্বগ্রাসী ক্ষুধা!
অনাবৃষ্টিযেমন চৈত্রের শস্যক্ষেত্রেজ্বেলে দ্যায়
প্রভূত দাহনতেমনি ক্ষুধার জ্বালাজ্বলে দেহ

দুবেলা দুমুঠো পেলে মোটে নেই অন্য কোনো দাবী,
অনেকে অনেক কিছু চেয়ে নিচ্ছেসকলেই চায়:
বাড়িগাড়িটাকা কড়িকারো বা খ্যাতির লোভ আছে;
আমার সামান্য দাবী: পুড়ে যাচ্ছে পেটের প্রান্তর
ভাত চাইএই চাওয়া সরাসরিঠান্ডা বা গরম,
সরু বা দারুণ মোটা রেশনের লাল চালে হলে
কোনো ক্ষতি নেইমাটির শানকি ভর্তি ভাত চাই;
দুবেলা দুমুঠো পেলে ছেড়ে দেবো অন্য-সব দাবী

অযৌক্তিক লোভ নেইএমনকিনেই যৌনক্ষুধা
চাই নি তো: নাভিনিম্নে-পরা শাড়িশাড়ির মালিক;
যে চায় সে নিয়ে যাকযাকে ইচ্ছা তাকে দিয়ে দাও
জেনে রাখো: আমার ওসবের কোনো প্রয়োজন নেই

যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবী,
তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড ঘটে যাবে;
ক্ষুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্টআইন কানুন
সম্মুখে যা কিছু পাবো খেয়ে যাবো অবলীলাক্রমে:
থাকবে না কিছু বাকিচলে যাবে হা-ভাতের গ্রাসে

যদি বা দৈবাৎ সম্মুখে তোমাকেধরোপেয়ে যাই
রাক্ষুসে ক্ষুধার কাছে উপাদেয় উপাচার হবে

সর্বপরিবেশগ্রাসী হলে সামান্য ভাতের ক্ষুধা
ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসে নিমন্ত্রণ করে

দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অব্দি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে
অবশেষে যথাক্রমে খাবো: গাছপালানদী-নালা,
গ্রাম-গঞ্জফুটপাতনর্দমার জলের প্রপাত,
চলাচলকারী পথচারীনিতম্ব-প্রধান নারী
উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ি
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ

ভাত দে হারামজাদাতা না-হলে মানচিত্র খাবো 

 

আমাকে খুঁজো না বৃথা

আমাকে খুঁজো না বৃথা কাশ্মীরের স্বচ্ছ ডাল হ্রদে,
সুইৎজারল্যান্ডের নয়নলোভন কোনো পর্যটন স্পটে,
গ্রান্ড ক্যানালের গন্ডোলায়ও নয়,
খুঁজো না ফরাসি দেশে পারীর কাফেতেমধ্যরাতে;
রাইন বা মাইনের তীরেসুবিস্তীর্ণ ফলের বাগানে

আমাকে খুঁজো না জাম্বো জেটে,
দ্রুতগামী যাত্রীবাহী জাহাজের কিংবা কোনো
বৃহৎ সমুদ্রগামী যাত্রীবাহী জাহাজের ডেকে

ভুল করে অন্ধ গলি-ঘুঁজি পার হয়েযদি এই
আঁধার প্রকোষ্ঠে আসো
দেখবে উবুড় হয়ে বাংলার এই মানচিত্রে
মুখ থুবড়ে পড়ে আছে চল্লিশ বছর
আমার তৃষ্ণার্ত ঠোঁট ঠেকে আছে
পদ্মার ওপর
এবং আমার দুচোখের অবিরল ধারা বয়ে গিয়ে
কানায়-কানায় ভরে দিচ্ছে সব কটি শুষ্ক নদী,
এবং দেখতে পাবে
শ্যামল শস্যের মাঠ
আমার বুকের নিচে আগলে রেখেছি

 

কোনো এক নারীর জন্য

চৈত্রের এক মধ্যরাতে
বুকের কপাট খুলে দুবাহু বাড়িয়ে
আমি অপেক্ষা করছিলাম
কোনো এক নারীর জন্যে
কৃষিজমিতে দাঁড়িয়ে
যে রকম অপেক্ষা করে উন্মুখ কৃষক
ফসল-ফলানো বৃষ্টির জন্যে

আমি অপেক্ষা করছিলাম
একজন নারীর জন্যেসম্পূর্ণ রমণী
যার স্পর্শে এই পাথর সোনা হয়ে উঠবে
ব্রোঞ্জতামা আর দস্তার সমারোহময় এই দেশে;

আমি অপেক্ষা করছিলাম
চৈত্রের নির্জন মধ্যরাতে
দুহাত পাখির মতো মেলে ধরে
হৃদয়ে মধ্যযুগ-উৎসারিত সমস্ত আবেগ সঞ্চারিত করে
নিছক এক নারীর আকাঙ্ক্ষায়

কী এক অচেনা আবেগের ভরে
আমি অপেক্ষা করছিলাম
মেঘহীন গুমোট গরমে
খরাপীড়িত বাংলায়
চৈত্রের কোনো এক মধ্যরাতে
দুবাহু মেলে ধরেবুকে টনটনে ব্যথা নিয়ে
এক পরিপূর্ণ নারীর জন্যে

যে নারী আমার ছোট এক কামরার
গুহাতুল্য বায়ুচলাচলহীন ম্রিয়মাণ ঘরে
শতাব্দীর সুবাতাস বয়ে চলে আসবে অকাতরে;
তার গৃহপ্রবেশের সঙ্গে-সঙ্গে হঠাৎ আলোর
ঝলকানি লেগে ঝলমল করে উঠবে
ঘরময় সকল আসবাবযার প্রতি পদপাতে
সুরভিত রক্তপদ্ম ফুটে উঠবেআমার বিছানার
প্রান্তে বসার সঙ্গে-সঙ্গে তার নিতম্বের নিচে
একরাশ রজনীগন্ধা হেসে উঠবে
দীর্ঘদিন অবহেলা ও অযত্নে পড়ে থাকা
আমার কটি তুচ্ছ কবিতার বই
সে স্পর্শ করামাত্র প্রতিটি পৃষ্ঠা থেকে
বসরাই গোলাপের গন্ধ বেরুতে থাকবে!
অবশেষেএই চুম্বনরহিত ঠোঁটে
সে তার ঠোঁট মেলাতেই সৌগন্ধ্যমণ্ডিত
আমার ওষ্ঠ থেকে অবিরল ধারায়
নিঃসরিত হতে থাকবে গালিবের গজলের মতো
কালজয়ী অনিঃশেষ পঙ্‌ক্তিসমূহ

 

প্রতীক্ষা

এমন অনেক দিন গেছে
আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থেকেছি,
হেমন্তে পাতা-ঝরার শব্দ শুনব বলে
নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছি বনভূমিতে
কোনো বন্ধুর জন্যে
কিংবা অন্য অনেকের জন্যে
হয়তোবা ভবিষ্যতেও অপেক্ষা করব

এমন অনেক দিনই তো গেছে
কারো অপেক্ষায় বাড়ি বসে আছি
হয়তো কেউ বলেছিল, “অপেক্ষা করো
একসঙ্গে বেরুব।
এক শনিবার রাতে খুব ক্যাজুয়ালি
কোনো বন্ধু ঘোরের মধ্যে গোঙানির মতো
উচ্চারণ করেছিল, “বাড়ি থেকো
ভোরবেলা তোমাকে তুলে নেব।
হয়তো বা ওর মনের মধ্যে ছিল
চুনিয়া অথবা শ্রীপুর ফরেস্ট বাংলো;
আমি অপেক্ষায় থেকেছি

যুদ্ধের অনেক আগে
একবার আমার প্রিয়বন্ধু অলোক মিত্র
ঠাট্টা করে বলেছিল,
জীবনে তো কিছুই দেখলি না
ন্যুব্জপীঠ পানশালা ছাড়া। চলতোকে
দিনাজপুরে নিয়ে যাব
কান্তজীর মন্দির ও রামসাগর দেখবি,
বিরাট গোলাকার চাঁদ মস্ত খোলা আকাশ
দেখবি,
পলা ও আধিয়ারদের জীবন দেখবি,
গল্প-টল্প লেখার ব্যাপারে কিছু উপাদান
পেয়ে যেতেও পারিস,
তৈরি থাকিসআমি আসবো
আমি অপেক্ষায় থেকেছি;
আমি বন্ধুপরিচিত-জনএমনকি
শত্রুর জন্যেও অপেক্ষায় থেকেছি,
বন্ধুর মধুর হাসি আর শত্রুর ছুরির জন্যে
অপেক্ষায় থেকেছি

কিন্তু তোমার জন্য আমি অপেক্ষায়
থাকব না,
প্রতীক্ষা করব

প্রতীক্ষা’ শব্দটি আমি শুধু তোমারই
জন্যে খুব যত্নে
বুকের তোরঙ্গে তুলে রাখলাম,
অভিধানে শব্দ-দুটির তেমন কোনো
আলাদা মানে নেই
কিন্তু আমরা দুজন জানি
ঐ দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য অনেক,
অপেক্ষা’ একটি দরকারি শব্দ
আটপৌরেদ্যোতনাহীনব্যঞ্জনাবিহীন,
অনেকের প্রয়োজন মেটায়

প্রতীক্ষাই আমাদের ব্যবহার্য সঠিক শব্দ,
ঊনমান অপর শব্দটি আমাদের ব্যবহারের
অযোগ্য,
আমরা কি একে অপরের
জন্যে প্রতীক্ষা করব না?
আমি তোমার জন্যে পথপ্রান্তে অশ্বত্থের
মতো
দাঁড়িয়ে থাকবো
ঐ বৃক্ষ অনন্তকাল ধরে যোগ্য পথিকের
জন্যে প্রতীক্ষমান,
আমাকে তুমি প্রতীক্ষা করতে বোলো
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকব অনড় বিশ্বাসে,
দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে
আমার পায়ে শিকড় গজাবে
আমার প্রতীক্ষা তবু ফুরোবে না
 

 

 

চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া

স্পর্শকাতরতাময় এই নাম
উচ্চারণমাত্র যেন ভেঙে যাবে,
অন্তর্হিত হবে তার প্রকৃত মহিমা,—
চুনিয়া একটি গ্রামছোট্ট কিন্তু ভেতরে-ভেতরে
খুব শক্তিশালী
মারণাস্ত্রময় সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে

মধ্যরাতে চুনিয়া নীরব
চুনিয়া তো ভালোবাসে শান্তস্নিগ্ধ পূর্ণিমার চাঁদ,
চুনিয়া প্রকৃত বৌদ্ধ-স্বভাবের নিরিবিলি সবুজ প্রকৃতি;
চুনিয়া যোজনব্যাপী মনোরম আদিবাসী ভূমি

চুনিয়া কখনো কোনো হিংস্রতা দ্যাখে নি

চুনিয়া গুলির শব্দে আঁতকে উঠে কি?
প্রতিটি গাছের পাতা মনুষ্যপশুর হিংস্রতা দেখে না-না করে ওঠে?
চুনিয়া মানুষ ভালোবাসে

বৃক্ষদের সাহচার্যে চুনিয়াবাসীরা প্রকৃত প্রস্তাবে খুব সুখে আছে
চুনিয়া এখনো আছে এই সভ্যসমাজের
কারু-কারু মনে,
কেউ-কেউ এখনো তো পোষে
বুকের নিভৃতে এক নিবিড় চুনিয়া

চুনিয়া শুশ্রূষা জানে,
চুনিয়া ব্যান্ডেজ জানেচুনিয়া সান্ত্বনা শুধু
চুনিয়া কখনো জানি কারুকেই আঘাত করে না;
চুনিয়া সবুজ খুবশান্তিপ্রিয়শান্তি ভালোবাসে,
কাঠুরের প্রতি তাই স্পষ্টতই তীব্র ঘৃণা হানে

চুনিয়া গুলির শব্দ পছন্দ করে না

রক্তপাতসিংহাসন প্রভৃতি বিষয়ে
চুনিয়া ভীষণ অজ্ঞ;
চুনিয়া তো সর্বদাই মানুষের আবিষ্কৃত
মারণাস্ত্রগুলো
ভূমধ্যসাগরে ফেলে দিতে বলে

চুনিয়া তো চায় মানুষের তিনভাগ জলে
রক্তমাখা হাত ধুয়ে তার দীক্ষা নিক

চুনিয়া সর্বদা বলে পৃথিবীর কুরুক্ষেত্রগুলি
সুগন্ধি ফুলের চাষে ভরে তোলা হোক

চুনিয়ারও অভিমান আছে,
শিশু ও নারীর প্রতি চুনিয়ার পক্ষপাত আছে;
শিশুহত্যানারীহত্যা দেখে-দেখে সেও
মানবিক সভ্যতার প্রতি খুব বিরূপ হয়েছে

চুনিয়া নৈরাশ্যবাদী নয়চুনিয়া তো মনেপ্রাণে
নিশিদিন আশার পিদ্দিম জ্বেলে রাখে

চুনিয়া বিশ্বাস করে:
শেষাবধি মানুষেরা হিংসা-দ্বেষ ভুলে
পরস্পর সৎপ্রতিবেশী হবে

.

তুমি: বিশ বছর আগে ও পরে

তুমি যে-সব ভুল করতে সেগুলো খুবই মারাত্মক ছিল। তোমার কথায় ছিল গেঁয়ো টানঅনেকগুলো শব্দের করতে ভুল উচ্চারণ: প্রমথ চৌধুরী’ কে তুমি বলতে প্রথম চৌধুরী’;  জনৈক’ উচ্চারণ করতে গিয়ে সর্বদাই জৈনিক’ বলে ফেলতে। এমনি বহুতর ভয়াবহ ভুলে-ভরা ছিল তোমার ব্যক্তিগত অভিধান। কিন্তু সে-সময়, সেই সুদূর কৈশোরে ঐ মারাত্মক ভুলগুলো তোমার বড়-বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলুম

তোমার পরীক্ষার খাতায় সর্বদাই সাধু ও চলতির দূষণীয় মিশ্রণ ঘটাতে। ভাষা-ব্যবহারে তুমি বরাবরই খুব অমনোযোগী ছিলে। বেশ হাবাগোবা গোছের লাজুক ও অবনতমুখী মেয়ে ছিলে তুমি। শোকাভিভূত’ বলতে গিয়ে বলে ফেলতে শোকাভূত তোমার উচ্চারণের ত্রুটিবাক্যমধ্যস্থিত শব্দের ভুল ব্যবহারে আমি তখন এক ধরনের মজাই পেতুম

২০-বছর পর আজ তোমার বক্তৃতা শুনলুম। বিষয়: নারী-স্বাধীনতা’! এত সুন্দরস্পষ্ট ও নির্ভুল উচ্চারণে তোমার বক্তব্য রাখলে যেদেখে অবাক ও ব্যথিত হলুম

আমার বুকের মধ্যে জেঁকে-বসা একটি পাথর বিশ বছর পর নিঃশব্দে নেমে গেল

 

 

Post a Comment

0 Comments