শুক্লপক্ষ ডেস্কঃ
পাক-ভারত-বাংলা উপমহাদেশে হিমালয় একটি অনন্য দর্শণীয় স্থান। যারা পাহাড় কে ভালোবাসে, পাহাড়ের রুক্ষতার আড়ালে সৌন্দর্য আর মুগ্ধতা খোঁজে, বোঝতে চায় পাহাড়ের ক্ষত কিংবা নিজের দুঃখের দীর্ঘশ্বাস বা সুখের ধারাপাত শুনাতে চায় পাহাড়কে-হিমালয় পর্বতমালা তাদের কাছে এক অনন্য স্বপ্নের নাম।
কাঞ্চনজঙ্গা। হিমালয় পর্বতমালার সর্বোচ্চ এবং ভয়ংকর সুন্দর শৃঙ্গের নাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা ৮৫৮৬ মিটার। উচ্চতার দিক দিয়ে এটি পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। তবে ১৮৫২ সাল পর্যন্ত মনে করা হতো, কাঞ্চনজঙ্গাই পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এক পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্গা। দৃষ্টিনন্দনের সাথে দুর্গম আর ভয়ংকর শব্দযুগল যোগ না হলে নাকি ঠিক ততোটা জমে না। দুঃসাহসিক অভিযানের জন্য দুর্গম হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবেই না জয় করবার দুর্দমনীয় মনষিকতা তৈরি হয়। এতো বেশি দুর্গম আর প্রতিকূল যে চূড়ায় পৌঁছাতে প্রতি পাঁচজনের একজনকে ব্যর্থ হতে হয়। এছাড়ও আছে মৃত্যু ঝুঁকি। গবেষণা বলছে ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে আরোহণকারীদের মধ্যে মৃত্যুর হার এক শতাংশ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যু হয় তুষার ধসের কারণে। একই কারণে লাশ উদ্ধারও সম্ভব হয় না। এবং বছরের পর বছর লাশগুলো অক্ষত অবস্থায় থেকে যায়। যারাই আরোহণ করতে যান দেখতে পান ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাশগুলো পড়ে আছে।
কাঞ্চনজঙ্গার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য দর্শনার্থীরা ছুটে যান সিকিম, কালিম্পং অথবা দার্জিলিংয়ে। দার্জিলিংয়ের টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্গা চূড়ার দূরত্ব ৮০ কিলোমিট্রা। হিমালয় চূড়া সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে শরতের নির্মল আবহাওয়ায়। বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো দেখতে পাওয়া যায় অক্টোবর মাসে। সূর্য একটু দক্ষিণে হেলে থাকার কারণে বেশি পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায় এই সময়টাতে।

তবে অত্যন্ত কষ্ট ও পরিতাপের বিষয় হলো ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত ভাগের সময় দার্জিলিং পর্যন্ত তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হবার কথা ছিল। শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও অন্যান্য দলিল সূত্রে এমনটাই প্রমাণ মেলে। তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতিবীদদের কূট চাল আর পাকিস্তানের রাজনৈতিকদের ধুরন্দরপনার জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে দার্জিলিংকে হারাতে হয়েছে। এই অতৃপ্তি, এই বেদনা প্রতিটি বাংলাদেশির আছে এবং থাকবে।
পঞ্চগড়ের সমতল ভূমির চা বাগান থেকে কাঞ্চনজঙ্গা
এতো পরিতাপের মধ্যেও আনন্দের বিষয় হলো, হিমালয় ভুলে যায়নি বাংলাদেশকে! তার মোহনীয় রূপ, রস আর ধ্রুপদী সৌন্দর্যের আভা উন্মোচন করে দিয়েছে বাংলাদেশেও। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে মেঘমুক্ত আকাশে বাংলাদেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় পূর্ণভাবে। সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে। কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্ব প্রায় ১৩৭ কি.মি। কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করতে তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণ পিপাসু মানুষ প্রতি বছরই ছুটে আসে তেঁতুলিয়ায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটকের আনাগোনা বেড়েই চলছে। আমরা যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস না করি, বায়ুমণ্ডলে যদি কার্বনডাইঅক্সাইড, ছোট ছোট কণার পরিমাণ না বাড়িয়ে তুলি তবে এই সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

0 Comments