বাক-স্বাধীনতা
শান্তির কানের ভিতর
অনর্গল বেজে চলেছে— আগ্নেয়াস্ত্রগুলোর পারস্পারিক
আলাপ-আলোচনা; এবং তারই নেপথ্য সংগীত...
‘ঠাণ্ডা লড়াই’-এর দিনগুলোর কথা বলছি না; দুনিয়াব্যাপী
চিত্তবিনোদনের স্বাদহীন সালুনে, নুনের যোগান দিতেই,
হয়তোবা SALT নামে খ্যাতি পেয়েছিল:
কৌশলগত অস্ত্র সীমিতকরণের আলোচনা!
শান্তি ও গণতন্ত্রের জন্য গলদঘর্ম নেতারা, দুনিয়ার
দেশে দেশে তৎপর রয়েছেন; বাক্-স্বাধীনতার পক্ষে
তাদের দৃঢ় অবস্থান— মুগ্ধ করছে আমাকে: অগ্নেয়াস্ত্রের মুখে
কুলুপ এঁটে দেয়াটা, একদমই, পছন্দ করেন না ওঁরা
মেশিন বলেই কি তার বাক্-স্বাধীনতা থাকবে না?
ইশারা
ফিরোজা পাথর,
তুমি স্থির হও— অঙ্গুরীয় শোভাবর্ধনে,
এখনও তরুণ-তুর্কি রয়েছে সময়;
এখনও সম্ভব:
বৃদ্ধদের ঘা-মেরে বাঁচানো যেতে পারে।
চৌদ্দ বছর— খুব সামান্য ব্যাপার নয়;
তবু এই সংখ্যাটির যাদুকরী
তাৎপর্য রয়েছে— প্রতিবিপ্লবে।
কিছুকাল বসে থাকো হাতের আঙুলে।
উচ্ছ্বাসের কিছু নেই। মানব-শরীরে,
একমাত্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অঙ্গ— এই হাত,
ভরসা রাখো: হাতের উপর। ফিরোজা পাথর,
পলায়নপর এই পৃথিবীর পথগুলো
পাল্টে দিতে— হাতের ইশারাটুকু লাগে।
পলাতকা পৃথিবীকে
পালাতে চাও?
পালিয়ে যাওয়া সহজ কী আর আছে
মেঘ পালিয়ে, ফিরলো— জলের কাছে
ঊর্ধশ্বাসে দিগন্তহীন নাও
ছুটছে— তবু, দেখলো: বুকেই জমা
হারান মাঝির পুরনো সেই দাঁড়
সব কাহিনীই করছো অস্বীকার?
নিজের ডানা, নিজের দিকেই মেলে
পালাতে চাও? পলায়ন তো ফাঁদও
স্তব্ধ পুকুর। জল— কী স্বচ্ছতোয়া!
নিস্তরঙ্গ জলের জাজিম ফেলে
আকাশ পারে দৌড়ে-যাওয়া চাঁদও
[হায় পলায়ন] —পুকুর জলেই শোয়া!
মোনাজাত
অনেকগুলো সহস্রাব্দ কেটে গেল। মানুষের দুনিয়ায় বিচার-অবিচার
চলছেই— মাবুদ, এখনও তোমার শেষবিচার শুরু হলো না! তোমার সাত
দোজখ, আট বেহেস্ত, বলতে গেলে, একদম আব্দুল্লাহবিহীন— কত সহস্র
বছরই না তোমার ফিরিস্তাগণ রক্ষণাবেক্ষণ করছে— ওইসব বিপুলায়তন
যন্ত্রণাগার, দিকচিহ্নহীন আরামায়েসকুঞ্জ!
ডিজিটালে, নিখিলতরঙ্গে লটকেপড়া পৃথিবীর দেশে দেশে, রাজাদের
প্রতিশ্রুতির অঞ্জলি গলিয়ে, টুপটাপ খসে পড়ছে: কর্মহীন কোটি কোটি
ছেলেমে’— হে পরোয়ার দিগার, তুমি তো দয়াময়, অসীমের লীলাসমুদ্র—
ফিরিস্তাগণের সহায়ক হিসেবে, এইসব ছেলেমে’দের, অন্তবর্তীকালীন একটা
এমপ্লয়মেন্ট কি দেয়া যায় না? মাবুদ!
অনুসিদ্ধান্ত
কষ্ট সহজ,
বুকের ভেতর কষ্ট পোষা, সহজ না ...
স্পর্শ সহজ,
হৃদয় দিয়ে হৃদয় ছোঁয়া, সহজ না ...
ইচ্ছে হলেই কাঁদাও তুমি, কান্না সহজ;
পাখির মতো ওড়াও দেখি! হাসাও দেখি!
সুখের স্রোতে মাতাল হৃদয় ভাসাও দেখি!
সহজ না
দুঃখ সহজ,
হত্যা সহজ,
জীবন সহজ ...
শুদ্ধতম জীবনযাপন, সহজ না ...
ভাবতে পারো অনেক সহজ, অ-নে-ক সহজ ...
বুক-ঝিনুকে মুক্তা হওয়া; সহজ না ...
ভালবেসে পাথর বুকে ফুল ফোটানো সহজ না ...
সংবিধিবদ্ধ অনুরোধ
এতটা স্বপ্নের আঁচে উষ্ণ কোরো না তার বরফআঙুল
স্বপ্ন মানে মৃত প্রজাপতি, প্রদর্শিত কাচজাদুঘরে;
ওড়ার বাসনা হলে খসে যায় ইকারুস-ডানা ...
ওখানে স্বপ্নের মধ্যে ঈশ্বরের বাস, বহুবিধ প্রলোভন আছে ...
শেয়ারবাজার আছে ... জলগন্ধ ... ফাঁদপাতা সর্বনাশ আছে!
এতটা স্বপ্নের বিষ দিয়ো না গভীর তার চুলের বিন্যাসে
বিন্দু বিন্দু স্বপ্নবাষ্প জমতে দিয়ো না তার চোখের আকাশে
ওখানে স্বপ্নের মধ্যে আয়ুহারা বুনোহাঁস ওড়ে
পাখিদের ডানায় আগুন, দিগন্ত রেখায় ধাঁধা,
বস্তুত স্বপ্নের নামে পাহাড়ের পাহারা বসেছে ..
গভীর খুঁটিয়ে দ্যাখো, মানুষের বাসনার প্রতিইঞ্চি মাটিতে পচন ...
এতটা দুঃখের জলে তাকে আর দিয়ো না ডুবিয়ে!
বন ও বোনের চোখে হলুদ জীবাণু;
টের পাই, হেমন্ত এসেছে ...
টের পাই, পাতা ঝরে যাবে ...
দুঃখের কুয়াশা নেমে, টের পাই,
পৃথিবীর শীত আরও দীর্ঘায়িত হবে ...
স্বপ্নের ওষুধে তাকে আরও বেশি অসুস্থ কোরো না!
কুশল
পড়ে আছ নিহত-বিক্ষত যেন উপসর্গ মাঠের ওপারে ...
তোমার কুশল মনোবাঞ্ছা করি নিয়ত নিখিলে;
বহুস্থানে বৃষ্টি এলে প্রকৃত ব্যাঙেরা নেচে ওঠে, গৌরী উৎসবে, স্নানে,
প্রকাশ্য পাথারে তারা অথৈ বেদনা করে, আর
প্রকৃত সত্যটি এই— খসে যাওয়া পাখির পালক তুলে আজকাল
কেউ আর ঘরেই রাখে না; তাতে বুঝি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
তবুও তো নীতি বলি তাকে, যে রকম জননীতি—
জনতার যাতে কোনও ভূমিকা থাকে না ...
ভন্তে গো, তোমাকেই বাঞ্ছা করি প্রথমোক্ত মাঠের ওপারে, অন্ধকারে,
ফলে, আমাদের অবসর ধর্মকর্ম হয় ... অবসাদে অবসর ভালো,
কেননা যে, ভালবাসা অপচয় অনেক হয়েছে,
দেশে দেশে, জগতে জগতে ...
এবার বিনত ডানা মেলে দেয়া ভালো প্রভৃতি-আকাশে;
একটাই মাঠ শুধু বৃত্তাকারে-চক্রাকারে ... আজীবন ঘুরি,
সরণ প্রকৃত অর্থে একে তো বলে না! তবু
তোমার কুশল আমি বাঞ্ছা করি, নব-নিরাকারে ...
জ্বর
এত দীর্ঘ আলপথ! বাসনাসম্ভব সত্যে সুদূর শৈশবে যাওয়া যেত ...
আর দ্যাখো, আমার গলায় আজ কী করুণ টাই জেঁকে আছে!
আল ভেঙে চারপাশে দেয়াল তুলেছি ... শুধু ওপরে ও দূরে আছে
চতুর্ভূজ মেঘলা আকাশ; ফলে, জীবনকেও তরলের স্মৃতি মনে হয়; আর
অনন্ত তুষারপাতে ঢেকে যাচ্ছে দিনের বর্ণনা ... তবু
এতটা বিপদ থেকে দু’চারটে দৃশ্যও কি তুলে রাখতে পারছি গোপনে?
ঘরে কিংবা মনে কিংবা ভোগে-উপভোগে ... নিরাপদ নিসর্গ-আশ্রমে?
বিচ্যুত স্বপ্নের থেকে কেন্দ্রাভিগ শব্দার্থের প্রাণে!
আজ এই এতটা বিমর্ষ গানে, এতটা আত্মীয়কণ্ঠে ডেকো না তো ছাই!
সর্বনাশের এখনও অনেক বাকি; এইদিন বর্ণনারও প্রচুর অতীত ...
তবু দেখ, জ্বর হলে কেমন সুন্দর লাগে!
জ্বর এলে, কতবার আকণ্ঠ চৈত্রেও আমি আপাদমস্তক কেঁপে উঠি!
কেঁপে কেঁপে উঠি শিহরণে ... অতএব জ্বর ভালো; শরীরে আগুন কিন্তু
মন ঠিকই পুড়ে যায় শীতে!
এমন তুষারপাত!
অফুরন্ত জ্বর এসে শুশ্রƒষাকুমারী যেন, আমাকেই মগ্ন ঘিরে রাখে ...
ঢুকে যায় রক্তে-মাংসে, অনুভবে, হাড়ে; বাৎস্যায়নঋদ্ধতায়
জ্বর এক আশ্চর্য প্রেমিকা! যোগে-ভোগে পর্যাপ্ত রমণী ...
সাকুল্যে আমিও আজ তিনশ’ পঁয়ষট্টি কোটি রাত জেগে আছি
আর জেগে জেগে গড়িতেছি প্রাণ ... আহা! এই প্রাণ আমি
এবার ছিটিয়ে দেবো অনার্য ভূগোলে ...
শাপমোচনকাল
বহুদিন হাঁটি নাই মাছের শহরে। বাতাসের ভাড়াবাড়ি তালাবন্ধ অনেক বছর। এইমাত্র খোলা হচ্ছে ... অতএব শেষ হলো মরিচার দিন। ধন্যবাদ হে ভোরের পাখিরা, কেননা, এখনও বেঁচে আছি। বহুদিন হাঁটি নাই ... কোথায়? তা বলেছি নিশ্চয়ই! শহরের তালা খুলে দেখা গেলো, বনরাজ নেই। বরং বীভৎস কোলাহল। টিকটিকি-তেলাপোকা ... নিজেদের বনরাজ ভাবে। অতএব এইসব বাতিল পদ্যের দিন ... আমরা এসেছি দেবী। দেবী তবু শুয়ে আছে খাটে। এ রকম মৃত্যুখাট আমাদের স্মৃতিরও অতীত! এবার তোমাকে দেবো নবতর সাজ। চোখ খোলো দেবী, চক্ষু খুলিয়া দ্যাখো, এ তোমার নতুন যৌবন ... আমাদের শুভদৃষ্টি তোমার নতুন স্রষ্টা আজ; তাহাকে কুর্ণিশ করো!
এইবার আমরা এসেছি। মাছের শহরে তুমি মৎস্যদেবী। তাহাদের স্তব-স্তুতি তোমাকেই দিয়েছিল জন্মমাত্র মৃত্যু-অভিশাপ। মনে পড়ে? ফুল হাতে বহুদিন হাঁটি নাই আমিষনগরে। তুমি দেবী, সত্য আর আমৃত্যু-যৌবনা। কবি আজ তোমার চরণে রাখে ফুল। খোলো দেবী, চক্ষু দু’টি খোলো, শাপমোচনের কালে চেয়ে দ্যাখো, আমি সেই আদিহাঁস, প্রখ্যাত সন্তাপ ...
কেমন সাঁতার দ্যাখো, কাঁপিতেছে জল!
উপ-আনুষ্ঠানিক
অজস্র অনেক রাত জেগে থেকে জেনেছি যে, রাত্রি
বড় দীর্ঘদেহী হয়; ফলে সেই রাত্রিকেই বিজ্ঞাপন করি
এই বিহিত বর্ণনা ... কী প্রকারে ধানদুধ খেয়ে গেছে
কত না ফড়িং! সেইসব দুর্ভিক্ষের সূচক-বন্দনা;
কৃষি ছাড়া আমাদের আর কোনও আনন্দ ছিল না,
অতএব কৃষিসূত্রে জন্ম নিল বৃক্ষগণ দূর-উপকূলে ...
আমরা অধিক দুঃখ সানন্দে যাপনহেতু জেনেছি যে, দুঃখ
খুব সুপ্রসিদ্ধ হয়; ফলে ধ্র“ব-দুঃখকেই বিজ্ঞাপন করি
এই মর্মজ্ঞান, ঋদ্ধ-প্রভাষণা ... কেননা যে,
আমার কৃষকপিতা নিরক্ষর না ছিলেন বলে
ফসলের বর্ণশিক্ষা ছিল তার আদিপাঠশালা; ফলে
আমরা অনেক শস্য বপন-কর্তনহেতু জেনেছি যে, শস্য
বড় নিরপেক্ষ বিজ্ঞানী হয়; তাই আজ শস্যকেই বিজ্ঞাপন করি
এই সর্বশেষ শব্দচিন্তারাশি ... আমাদের আনন্দ-বিস্ময় ...
ভিত্তিপ্রস্তর যুগ
দুপুরের চোখে কিছু স্বপ্ন থাকা সমীচীন হয়
তবে কিনা, বোশেখের জলস্বপ্ন এঁকেছিল চৈত্রবিকেল ...
ঘুঘু কথা কয়; আর
ভালবাসা ফোটাচ্ছে সংশয় ঘরের চাতালে—
এই তিন দুঃখ নিয়ে জেগে পড়ে গ্রাম
এবং ঘুমিয়ে ওঠে পদ্মাপাড়ে জেলেদের বউ
অতএব এসো,
ভালবেসে আমরা পৃথক জামা পরি আর
সন্নিহিত কোণ এঁকে দুইদিকে গতিশীল হই!
কেননা, বেঁচে থাকার আনন্দ ও সুবিধা এই—
আরও কিছু স্বপ্ন দেখা যায় ... আর তার প্রমাণস্বরূপ
ভিত্তিপ্রস্তর যুগ ঘনীভূত হতে থাকে ক্রমে ...
বিবিধ দহন
ফেলে এসেছি লাল-নীল আলোর উৎসব, ছদ্মস্বপ্নপ্রণোদিত স্মৃতিদের বাড়ি ...
পশ্চাদ্ভূমিতে জাগা নিয়রের গান, হিমকান্না, কাঠের গুঁড়িতে লিপ্ত কুড়ালের মতো মেঘপৃষ্ঠে কোপমারা চাঁদ ... ঢেউঢালা কল্লে¬ালিত চন্দ্রাভাস নদী ... নদীগুলি মৃত ...
ফেলে এসেছি আনন্দের সাংকেতিক ঋতু ... প্রযতœ-খোদিত যত মুখস্থ ঠিকানা, হংসস্নাত দিঘির দরদ ... এইসব গান ... জোনাকির যাজক গৌরব ...
ও নিদ্রালু চাঁদবোন, সে বড় অদ্ভুতগাঁও! মৌনতাবিমুগ্ধ ভোরে জেগে দেখি,
আশ্চর্য পাখির দেশ; বিবর্ণ রঙের প্রগল্ভতা ... আর সেই লোভদীপ্র
বিষমাখা ছুরি রক্তদৃশ্যে ঝলসিত, চিকচিক করে ... আমাদের আরও আরও
অভিমান ছিল ... অন্ধবিদ্যালয়গুলো অতশত আনন্দ বোঝেনি ;
মিথ্যাবাদী রাখালের কথা কারও অজানা ছিল না, তারা তবু
আগুন! আগুন! বলে দেশময় ছিটিয়েছে জল। তারপর ...
অনেক বছর গেলে, একদিন আগুনেই পুড়েছে সংসার ... আহা!
তবু এই আমাদের আনন্দ ঘোঁচেনি; আর এই বর্ণ পাখির দেশে
বায়ান্নটি ডানা মেলে পাষাণের চোখজলে ভাসি ... এবং প্রচ্ছন্ন কথা ...
পাথরের দৃষ্টিসীমা বৃত্তায়িত করে যথারীতি মর্মান্তিক উড়ি ;
আমার গৌরব কীসে? সিঁড়িতে উঠেছি বটে! বরং
তাহাতে বাড়ে সিঁড়িরই গৌরব ... পৃথিবী সমাসে তৃপ্ত, আমি থাকি
ব্যাসবাক্যে মৃত ...
তা হলে বোনের কানে তথ্যপ্রপাতের ছলে বলা যায়, ওগো চাঁদবোন,
আজ এই হলুদচর্চিত রোদে, শুয়োরের মতো অন্ধকারে, ডানার যন্ত্রণা
ঢেলে বুঝে গেছি, বস্তুত ভাষার জন্য নীরবতা অধিক জরুরি!
গণতন্ত্র : ক্ষেপণযোগ্যতা, রপ্তানিযোগ্যতা
এটা বরং ভলোই হয়েছে যে, গণতন্ত্রের ক্ষেপণযোগ্যতা সম্পর্কে
আমাদের মনে আর কোনও সংশয় রইল না; আমরা জানলাম,
উপসাগরের রণতরী থেকেও গণতন্ত্র ছুঁড়ে দেয়া যায় মুক্তিকামী
বাগদাদের লোকালয়ে। নির্বোধ জগতবাসী খামোখাই তাকে
মিসাইল ভ্রম করছে, বলছে, এটা অমানবিক, যুদ্ধনীতির
ঘোরতর পরিপন্থী ... এই লাগামহীন আবেগ ঝেড়ে ফেললেই
বোঝা যাবে, মারণাস্ত্রের প্রতীকী তাৎপর্যগুলি। গণতন্ত্রের এবং
মুক্তিরও রপ্তানিযোগ্যতা সম্পর্কে যাদের একদম ধারণা নেই,
তারাই অমন আদেখলেপনা করবে, আবেগী সমাবেশ করবে
এ রকম ত্রাণ যুদ্ধের বিপক্ষে ... গণতন্ত্র, এমনকী, ছুঁড়ে দেয়া যেতে পারে
মার্কেট এরিয়াতেও; এক হাজার শিশু কিংবা শ’চারেক
গর্ভবতী মাতৃমৃত্যু তো বড় কথা নয়! নতুন শতাব্দীর
মূল দাবি হলো গণতন্ত্র আর মুক্তি; সেটা সামরিক এলাকা চাইলে
তারাও পাবে, আবাসিক এলাকা চাইলে, তারাও! কিন্তু ক্ষেপণ করা হবে
মিসাইলের প্রতীকে। ক্লাস্টার বোমার রূপকে হলে বেটার, তাতে
ক্রমিক বিস্ফোরণে গণতন্ত্র আরও বেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে, মুক্তির
শেকড় যাবে ষোলো ফিট মাটির গভীরে, গণতন্ত্রে ছেয়ে যাবে
ধূলিওড়া ইরাকের সমস্ত আকাশ ...
রাষ্ট্রসঙ্ঘ
এহেন মুহূর্তে তুমি হায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের মনীষা, রাজহাঁসের উঁচু-লম্বা গলার মতন আগ্রহ বাড়িয়ে তোলো আনবিক যুদ্ধদগ্ধ পৃথিবীর সুকোমল স্তনে! লুণ্ঠিত মাটিতে শুয়ে অুনভব করি সেই দৃষ্টির আরাম। যে তোমাতে বিচার প্রার্থনা করে, কুমারী নিষেক, তার প্রতি রাষ্ট্র, ধর্ম, গোত্রাচার ... অসীম আগ্রহে জেগে ওঠে। হায় রাষ্ট্রসঙ্ঘ তুমি, তুমি সেই আদিম লালসা, অভিভাবকত্ব নিয়ে আদরের ছলে করো শিশুযৌনাচার! লাঞ্ছিতা পৃথিবী নিয়ে আমি তবু তোমার দুয়ারে যাই, আধুনিক কাজীর দরবারে। গিয়ে দেখি, শ্যাম্পেন-স্নানের পর রতিক্লান্ত বিচারক অচেতন, ঘুমে। দুয়ারে, প্রবেশপথে, আণবিক অস্ত্রগুলি অতন্দ্রপ্রহরী সেজে আছে ...
ডানায় ভ্রমণক্লান্তি, ফিরে যাচ্ছি পরাজিত পাখি। এহেন মুহূর্তে তুমি হায় রাষ্ট্র, হায় সঙ্ঘনীতি, গণতন্ত্রে খুঁজে পাচ্ছ মানবতা; মানুষের মুক্তি ও সমতা!
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
বজ্রাহতের মতো থমকে আছ বিস্মিত হরিণী। হাঁসছানাদের জন্য
ভালবাসা নিয়ে গৃহস্থের মেয়েগুলি শামুকসন্ধানে গেছে বিলে।
এইখানে কী করে মাটির মধ্যে এত স্বপ্ন ঘুমায়ে রয়েছে— সেইকথা
ভেবে তুমি বিস্ময়পূর্বক ভেসে যাচ্ছ ধরলার ঢলে সীমাহীন; আর
মেয়েগুলি বিল থেকে ফিরেই এলো না! হাঁসছানাদের জন্য শৃগালেরও
অপত্য দরদ উথলে ওঠে, ইন্টারনেটে ভাসে তার পর্যাপ্ত নমুনা ... কী ভাবে
বিলের মধ্যে মেয়েগুলি নিরুদ্দিষ্ট হলো— সেই গল্প অবহিত হও;
স্বপ্নাহতের মতো দেখেছিল তারা, বিলের শামুক সব আচানক
হাঙরের হা হয়ে জেগে উঠল অপার যমুনা! ধরলার ঢেউয়ে ঢেউয়ে
ভেসে যাচ্ছ বেদনাপূর্বক; এইখানে কী করে বিলের থেকে মেয়েগুলি
ফিরেই এলো না ... হাঁসছানাদের জন্য শৃগালমাতৃত্ব থেকে বুঝে নিয়ো
অইসব রাজনীতিপনা ... এশিয়ার দুঃখ নিয়ে য়্যুরোপে সভা হলে
অর্থনীতি কার পক্ষে হাঁটে? জেনে নাও, ও হাঁসের ছানা!
সমাজতান্ত্রিক বিপর্যয় এবং একটি কাঁথার গল্প
একটি সমান্য কক্ষে অসামান্য উপস্থিতি আজ। বারো কোটি মানুষের মুক্তিস্বপ্নে বোনা
কাঁথাটিকে টুকরো টুকরো করা হবে— তার আলোচনা।
বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে, সমতট থেকে, বোদা ও নাচোল থেকে, টেকনাফ থেকে মতামত উদ্বিগ্ন আছেন। আদমজী এসেছে, কৃষি আছে, ক্ষেতমজুরিও পাশে বসে আছে ভয় আর উত্তেজনা নিয়ে। বহুগুলি বিশ্ববিদ্যালয় এসে সামান্য কক্ষের মধ্যে উপবিষ্ট আছে। একটি অনুরোধ উঠে কর্তাদের পা ছুঁয়ে কেঁদে ফেলেছিল; সে চায় সামান্য কিছু। কাঁথাটির অখণ্ডতা চায়। নাটকের পঞ্চমাঙ্কে একটানে ছিন্নভিন্ন কাঁথা। অ্যাম্ফিথিয়েটার থেকে ফিরে এসে আগোচরে একটি উদিত স্বপ্ন দীর্ঘ ঝুলে আছে সিলিং ফ্যানের সাথে, নিখিলের খিলবন্ধ পল্টনের প্রীতম হোটেলে।
আমি জানি, ঝুলে থাকা দীর্ঘ হতে হতে এই কাঁথা ঢেকে দেবে এশিয়ার অন্ধকারশীত। একটি সামান্য কক্ষে অসামান্য উপস্থিতি একদিন অন্য অর্থ পাবে।
লক্ষ করো, পৃথিবীর সকল সিলিং ফ্যানে ঝুলে আছে দীর্ঘ সম্ভাবনা।
প্রণয়ঘটিত
তোমার আনন্দ, তৃপ্তি ... শনাক্ত করেছি
এসো আজ আমাকে শনাক্ত করো, মৃত ...
ভালোবাসা দাগী চোর বিধানে, বিধৃত;
তাকে গ্রেফতার-ছলে তোমাকে ধরেছি।
দোঁহেই দোঁহার কাছে প্রার্থী দোনো পাণি
অথচ না-জানি কোন ধূর্ত-অজগর
এমতো পেঁচিয়ে ধরে প্রকাশের স্বর ...
পাণিপ্রার্থী, এই নাও চক্ষুভরা পানি!
আপন নাভিটা কেটে রক্ত কিছু দাও!
আপাদমস্তক সুখ চাকু ঠেঁসে চিরি
ভালোবাসা জন্ম আর মৃত্যুর সংজ্ঞাও
দোঁহার আনন্দে দোঁহে যাঁচি হারিকিরি;
নিরীহ স্তনাগ্র খোলো, ছিঁড়ি বিষদাঁতে ...
দুনিয়া দেখুক প্রেম বিস্মিত প্রভাতে!
ত্রাণসুন্দরী
ব্রোঞ্জের যুদ্ধ জাহাজ এসে দাঁড়ালো বন্দরে ;
ফলাফলে- উত্তাল সমুদ্র হলো আমাদের মন,
ঝড়ের স্বভাব সেই বৈদেশিক হাওয়া লেগে
দুলে-ওঠা নৌকার পালের মতো নেচে উঠলো ঢেউ-
তরঙ্গের ফেনিল উচ্ছ্বাস আজ আমাদের প্রেমার্ত-হৃদয় ;
সমুদ্রেরও পঞ্জিকা রয়েছে-
একাত্তরে বঙ্গোপসাগর আর দু’হাজার আট-এ
এরা কিন্তু এক নয়- একইরূপ জল-ঢেউ-ঢেউয়ের বিস্তার-
তবু নয় ; জলে-ঢেউয়ে অভিন্ন বিস্তার নয় এরা-
গুপ্ত জাহাজ এসে দাঁড়ালো বন্দরে ;
এতো সশস্ত্র কোমল- এতো কাব্যময়-
আমরা এর ভক্তবৃন্দ, প্রেমিক হলাম- আবেগ-অস্থির ;
আর দ্যাখো, দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছি ঝাঁক ঝাঁক মন-
মিলিশিয়া গোলার আঘাতে ; নানাবর্ণ তেজ-এ
ক্ষেপণাস্ত্র গেঁথে যাচ্ছে রোমে, রোমকূপে ;
ভালোবাসা- হৃদয়ের এতো সাংঘর্ষিক !
সমঝোতা স্মারক
শহর নিকটে নয়, গ্রাম বহু দূরে
এমন আধা-নির্জনে, চলো, সংসার পাতি
নিরবচ্ছিন্ন বনিবনা নয়__
প্রতিদিন দ্বন্দ্ব হোক আমাদের
এই ফাঁকে, পাখিরাও ঝগড়াঝাটি শিখুক
মৃদু বাতাসের দিন হরমাসেই জিতে নিক
দমকা-হাওয়ার পদক;
আমাদের পুত্রকন্যারা, পরস্পরের দিকে পীঠ রেখে
আঙুল উঁচিয়ে বলুক:
ওই তো শহর
ওই তো গ্রাম
ঠিক সে-সময়, ওদের মাথার ওপর দিয়ে বিমান উড়ে যাক
ডানার ইতিহাস নিয়ে দ্বিমত ও সহমত পোষণ করতে করতে
ওরা একটা সমঝোতা-স্মারকে স্বাক্ষর করুক
জিরাফ ও ডলফিনের ভাষা
ওপাড়ে জিরাফের ভাষায় কথা হয়
এপাড়ে ডলফিনের
মাঝের স্রোতে হাবুডুবু খাচ্ছে রোদনস্নাত মানুষ
প্রাণিদের রতিশৈলীর ভেতর থেকে
ভাষাসূত্র উদ্ধার করতে হচ্ছে আমাকে
ইতিহাসের মর্মমূলে কী প্রকার হিতোপদেশ আছে
যার অনুসারী হয়নি হতভাগা দেশ; তারই সন্ধানে,
অনেক বছর পর, একদল মানুষ আসবে
বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রতিটি পৃষ্ঠায়, মার্জিনে
খুঁজে পাবে, এইসব ভাষাবিদ্যার ঘাম
স্বেদবিন্দু থেকে সুগন্ধী তৈরির আশ্চর্য কৌশল
ওইসব মানুষেরই জানা থাকবে
রহমান হেনরী, জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯৭০ তদানীন্তন রাজশাহী জেলার নাটোর মহাকুমায়। পড়াশুনা করেছেন নাটোর ও ঢাকায়। পেশাগত জীবনে সরকারের প্রশাসন ক্যাডারে কর্মরত (তবে সম্প্রতি সরকারি চাকরি বিধি লঙ্ঘনের দায়ে চাকরীচ্যুত হয়েছেন)।
উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ: বনভোজনের মতো অন্ধকার (১৯৯৮); গীতঅনার্য (১৯৯৯); প্রকৃত সারস উড়ে যায় (২০০০); সার্কাসমুখরিত গ্রাম (২০০১); খুনঝরা নদী (২০০৫); তোমাকে বাসনা করি (২০০৫); গোত্রভূমিকাহীন (২০০৮); শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০০৮); ত্রাণসুন্দরী (২০০৯); ব্রজসুন্দরীর কথা (২০১২); প্রণয়সম্ভার (২০১৪)

0 Comments