দেহতত্ত্ব
বিদেশি ভাষা জানি না। তবু মনে এবং মন্ট্রিয়লে
তোমার ভেতরে, তোমার দেহদেশে ইমিগ্রেন্ট হয়ে থাকি!
পেয়েছি পাসওয়ার্ড। দশ দিগন্ত, দশ দিক, দশ হাত, দশটি ভুল
বাদ দিয়ে কেবলি তোমার কেবলায়-তোমাতে নিমগ্ন হই
নিমজ্জিত হই তোমার গহীনে আগ্নিয় লাভার মর্মমূলে!
তোমার ভেতরে গৃহগ্রহগাং’এ প্রবেশ করি, আহ প্রবেশ করি—
এবং প্রবেশ করি; অসূর্যস্পর্শী তোমার খনিজ পাওড্রেটেটিয়েট স্পর্শ করি
প্রবেশ করতে করতে বিদ্যুৎচেরা ঝিলিকে পেরিয়ে যাই দিগন্ত!
শরীরের ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা জানি না। আমি ফ্রান্স শিখতে চাই না।
ফরাসি ভাষার চেয়ে তুমি এবং তোমার শরীরের ভাষা সহজ। তোমাকে শিখব।
তোমার বরফে, তোমার হরফে হাহাকার নেই।
ভিন্নতা
ভিন্ন ভিন্ন ফুলের সৌন্দর্য ভিন্নতর।
ভিন্ন ভিন্ন ফলের স্বাদ ভিন্ন ধরনের।
ভিন্ন ভিন্ন নারীমন ভিন্ন রকমের।
নামাজের মধ্যে এক ধরনের শান্তি,
মদ্যপানের মধ্যেও আরেক রকমের আনন্দ,
সঙ্গমের সুখ আলাদা।
যাও ভ্রমণে, তীর্থস্থানে। সেখানেও অফুরন্ত মুগ্ধতা!
সঙ্গমের তৃপ্তি, ভ্রমণের স্বাদ,
. গ্রন্থপাঠের আনন্দ এক নয়; অভিন্ন!
ব্রহ্মপুত্রের পুত্র
আমাদের পিতার নাম ব্রহ্মপুত্র,
মায়ের নাম- নান্দিনা।
তারা কোনদিনই বিবাহিত ছিলেন না
তবু আমরা তাদের অকৃতিম সন্তান
ওরফে তারা আমাদের পবিত্র পিতামাতা।
*
নাড়ির টান টের পাই মাতাপিতার মমতা
তাদের পরানের টান-
গুন টানার মতো, দাঁড় টানার মতো
লগ্গি ঠেলার মতো
বৈঠার মতো পালতোলা নৌকার মতো।
*
আমাদের ছোটফুফুর নাম পান্তাভাত
ছোটবোনের নাম- সবুজ ধানক্ষেত
বড় ভাইয়ের নাম- চৈত্র সংক্রান্তি,
ছোট ভাইয়ের নাম- চর্যাপদ।
এক সৎ ভাই জন্মের পরই বসন্তে মারা যায়-
তার নাম ছিলো- গারো পাহাড়।
আমারও দুটো নাম ছিলো,
একটি বিক্রি করে অভাবে ভাত খেয়েছি
আরেকটি বিক্রি করে চলে এসেছি বিদেশে।
প্রার্থনার ঘরগুলো, গ্রন্থগুলো
একটি স্নিগ্ধ ভোর কাঁদছে—
কাঁপছে মসজিদ!
তপ্ত দুপুর পুড়ছে—
জ্বলছে বিষ্ফোরিত চার্চ!
অপরাহ্ন তিরতির থরথর করছে—
প্যাগোডা জ্বরাক্রান্ত!
সুন্দর বিকেল ভেঙ্গে পড়ছে—
ধসে যাচ্ছে গির্জার চূড়ো!
এবং মায়াবী সন্ধ্যাও সন্ত্রস্থ—
মরে যাচ্ছে মন্দির।
প্রার্থনার ঘরগুলো
ঘন অন্ধকারে মৃত।
আসমানি কিতাব—
আমাদের গ্রন্থগুলো বিলুপ্ত!
আইডেন্টি
আরবি হরফ দেখলে মনে হয়-
আরব জাতিরা তাদের হরফের ক্যালিগ্রাফি
ডান দিক থেকে
নেমে গেছে এরাবিয়ান সাগরে।
কাঞ্জি, হিরাগানা, কাতাকানায় উপস্থাপিত হয়
জাপানি জাতির জাতীয় জটিল জীবন।
আকাশ থেকে ধীরে ধীরে
শব্দের সিঁড়ি বেয়ে যেনো জলপরী নেমে গেছে
প্রশান্ত মহাসাগরে।
ইংরেজি আলফাবেট আন্তর্জাতিক হাইওয়ে
যাবতীয় ভাষার ভাষান্তরের সেতু।
মৃত বা বিলুপ্ত হিব্রু হরফে রয়েছে ইসরাইলিদের নৃতত্ত্ব
১১ টি বর্ণ মরুভূমিতে হারিয়ে গেছে
১১ টি ডুবে গেছে বরফাবৃত ভূমধ্যসাগরে।
হিন্দি অক্ষর মনে হয় ভারতীয় ধুতি; সিঁথির সিঁদুর
স্তনের অহংকার নিয়ে
বোম্বের নায়িকার মতো নৃত্য করে ঢেউ-টিন
তরঙ্গ তুলে ভারত মহাসাগরে।
প্রাক-ভাষার পর প্রাচীন ভাষা তামিল জাতির
পূর্ব নারী, পূর্ব পুরুষের ভাষা, বৈশিষ্ট, বংশ পরিচয়
তামিল অক্ষর বহন করছে
নৃতাত্ত্বিক স্বাক্ষর-
ছড়িয়ে আছে পারিবারিক ভিটেমাটিতে।
বাংলা বর্ণমালায় চকচক করে বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল রঙধনু।
আর আমার ব্যক্তিগত ব্রেইল পদ্ধতিতে
পাই তোমার ঘ্রাণ!
কি বলেন হে ভাষা আবিস্কারিক গ্লটোগনি?
মাছ মন্ত্রি
মাছদের কি দিন আছে, রাত্রি আছে এবং সন্ধ্যা, সান্ধ্য আইন?
অথবা জুম্মা বার!
নতুন নামকরণের প্রেক্ষিকে প্রায় বিলুপ্তের পথে শুক্রবার
অনেক প্রজাতের মৎস্য এবং মৎস্যকুমারী বিলুপ্তির তালিকায়
যেমন ইলিশের মাংস!
কুম্ভঅশ্রুর মতো মাছের কান্নার জল কি নদীর জলকে বিভ্রান্ত
এবং বেদনাক্রান্ত করে!
মাছেদের রক্ত শীতল; মৎস্য-কাম-ধর্ম মন্ত্রিদের রক্ত ঠান্ডা।
মাছেরও সেক্স আছে; ঘুম আছে, নেত্রপল্লব নেই-
চোখ খুলে সাঁতার কাটতে কাটতে ঘুমায়
মাছমন্ত্রিরা ডুবে ডুবে জল খান।
তারা মাছের চেয়ে ভালোবাসে জলকেলী, জলপরী, জুম্মাবার।
মাছ এবং মৎস একই অর্থ
কিন্তু শুক্রবার আর জুম্মাবার বহন করে ভিন্ন অর্থ।
মৎস্য চাষের পাশাপাশি তারা জলপরী চাষের ফাইলেও
সুলিখিত সই করে।
কিন্তু জানেনা রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞাপনের ভাষাঃ
‘সুলেখাকালি কলঙ্কের চেয়েও কালো।’
মিডিল ফিঙ্গার
কোবরা স্টারশিপ’এর মিডিল ফিঙ্গার বিখ্যাত গানটা আমাকে টানে নি,
তার চেয়ে আদিবাসীদের শিকারে ব্যবহৃত
সাংকেতিক ইশারার ভাষায়
বৃদ্ধা, তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা, কনিষ্ঠার কারুকাজে
আমি মুগ্ধ এবং আমিও ব্যবহার করি ভিন্ন ভাষায়
টিপসই-স্বাক্ষরে।
বডি লেঙ্গুয়েজ আর ফিংগার লেঙ্গুয়েজ সমগোত্রীয়
তবে তফাৎ বাংলা আর অসমীয় বর্ণমালার মতো।
জেনেছি, চিকিৎসাবিজ্ঞানে আঙ্গুলের কোনো নাম নেই,
সেখানে নির্দেশিত হয়- [১ ২ ৩ ৪ ৫] সংখ্যায়।
ঐতিহাসিক তর্জনীর ভূমিকা ইতিহাসে আছে,
বাগদত্তা বন্ধনের জন্য নির্ধারিত
অনামিকা!
তবে মিডিল ফিঙ্গারের অনেক বদনাম।
তুমিও ভালোবাসো মিডিল ফিঙ্গার!
অঙ্ক বইয়ের গল্প
জিওগ্রাফিক চ্যানেলে অভিনয়ের অফার পেয়ে
অঙ্ক বইয়ের পঁচিশ পৃষ্ঠা থেকে
লাফিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে তৈলাক্ত বাঁশের বানর।
পানি মিশানো দুধওয়ালাও এখন শীতে চাদর জড়িয়ে ভোরে
বিক্রি করে তাল-খেজুরের রস।
*
জুলেখা বাদশার মেয়ে নয়; গনি মিঞার মেয়ে,
যে গনি মিয়ার নিজের জমি ছিলো না,
অন্যের জমি চাষ করতো
সে এখন আওয়ামী লীগ করে।
*
পাঠ্য পাট গণিত, বাংলা বই প্রথম পাঠ, পাঠশালা
খালি হয়ে যাচ্ছে।
দাবানল আর উজাড় করা বন দেখে ফিরে এলো বানর,
তখন গ্রন্থগুলো অন্ধ হয়ে গেছে!
জিরাফ, কচ্ছপ এবং শাদাফুল
তিনি তুলনা করছিলেন প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে সাবেক স্ত্রীর
মাপছিলেন, ভাবছিলেন।
দু’ জনেই শাদা।
একজন বকুল ফুল, একজন নেবু ফুল;
তাদের সৌরভে এখনো বিভোর শনিবার সন্ধ্যা
এবং রোববার রাত্রি!
প্রাক্তন দেখলে তিনি জিরাফ হয়ে উঠেন,
আর সাবেক দর্শনে মনে পড়ে কচ্ছপের কথা!
আলোচ্য পুষ্প প্রেমিককে আপনারা সবাই চেনেন,
ভাবছি, তাকে নিয়ে একটি চিত্রনাট্য তৈরি করবো।
দূরত্ব
পৃথিবীর প্রথম দিন থেকে পৃথিবী শেষ দিনের দূরত্বে
আদি-অন্ত দৈর্ঘ্য তৈরি করে
তুমি ভুলে গেলে মসলার বিবিধ ঘ্রাণ,
আমিও ভুলে গেলাম মেডিসিনের গন্ধ।
দূরত্ব এবং দৃশ্যের বাইরে
হু হু করে অনূদিত হাহাকার নামছে, শীত নামছে
কাঁপছে ঠাণ্ডা আগুন,
জমছে আগুনের বরফ!
একদিন আমরা
তালাচাবির ভূমিকায় সুইসুতার মতো গেঁথে ছিলাম
পরস্পরের দেহের উষ্ণতায়।
আমরা রচনা করতে পারিনি নক্সিকাঁথা।
ভুলে গিয়েছিলাম—নয়ের ঘরের নামতা।
এখন তুমি ছিটকে গেছো জন্মের আগে,
আমিও মৃত্যুর পরে।
আমাদের এই দীর্ঘ দূরত্ব—
নীল সাগর ও নীলাকাশ দূর দিগন্তে একাকার,
তবু একা। দেখা হবে না।
দূরত্বের মাঝখানে
মসলার ঘ্রাণ, মেডিসিনের গন্ধ, ঠান্ডা আগুন
দত্তক আর পালিত সন্তানের মতো এক-তৃতীয়াংশ অধিকার নিয়ে
সবুজ বেরিয়ে আসে জরায়ু থেকে।
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
মূলত কবি। তবে সাহিত্যের সব শাখায় তাঁর বিচরণ রয়েছে। করেছেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা। তাঁর কবিতায় গ্রামীণ জীবন যেমন এসেছে তেমনি এসেছে নাগরিক জীবন- জীবনের জটিলতা, প্রেম, পরবাস, পরাবাস্তব প্রভৃতির প্রতিফলিত। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ৫০টির ওপরে। সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও গবেষোণায় অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশে পুরস্কৃত হয়েছেন।


5 Comments
প্রত্যেকটি কবিতা অপূর্ব। অভিনন্দন কবিকে। শুভ কামনা সম্পাদককে।
ReplyDeleteঅনেক অনেক শুভেচ্ছা। ভালোবাসা।
Deleteভালো লাগল।একসঙ্গে এতগুলি কবিতা পড়তে পেয়ে বেশ লাগলো।
ReplyDeleteExcellent
ReplyDeleteচমৎকার, এন্টি পোয়েট্রি ! দুলাল ভাইয়ের পক্ষেই সম্ভব এরকম সব কবিতা লেখা। মুগ্ধতা শুধু নয়, ভাবনায় জড়িয়ে নিলাম।
ReplyDelete