জীবন্ত হুমায়ূন ভাইয়ের শেষ ছবি এবং আমাদের মান-অভিমান ।। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

হুমায়ূন আহমেদের সাথে লেখক 

এক সকালে হুমায়ূন ভাই বললেন, ‘দুলাল, দুপুরে স্টেডিয়ামে আসো। এক সাথে খাবো। যথারীতি গেলাম। লাঞ্চ করতে করতে বললেন, ইনকিলাব ভবনে যাবো। আতাহারকে এই গল্পটা দেবো-পুর্ণিমার জন্য। চলো আমি তো অবাক! বললাম, “আপনি, মওলানা মান্নানের কাগজে লিখবেন? আপনার বাবাকে না মুক্তিযুদ্ধের সময় ওরা হত্যা করেছে! আপনি না একজন শহীদের সন্তান! আপনি সৌরভ, আগুনের পরশমণি, ১৯৭১এর মতো উপন্যাস লিখেছেনরেগে গিয়ে বললেন- আমার পাঠক, পয়সা এবং পৃষ্ঠপোষকতা দরকার

আমার বাসায় তখন কোনো ফোন ছিলো না। অফিস থেকে প্রতিদিন শামসুর রাহমান আর হুমায়ূন আহমেদকে ফোন করতাম। প্রায়ই ফোন ধরতো ছোট্ট মেয়ে শীলা। হুমায়ূন ভাইয়ের সাথে তখন আমার খুব খাতির। শুধু তাঁর সাথেই নয়; গুলতেকিন ভাবী, আহসান হাবীব শাহীন (কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব) সবার সাথেই পারিবারিক সম্পর্ক। পল্লবীতে আয়শা খালাম্মা থাকতেন ছোটছেলে আমাদের বন্ধু শাহীনের সাথে। ফলে জালের মতো সবার সাথে জড়ানো ছিলো সম্পর্ক। জাফর ভাই নিউ জার্সি (আমেরিকা) থাকলেও তাঁর সাথে যোগাযোগ ছিলো সাপ্তাহিক প্রবাসী সূত্রে। তিনি ওই পত্রিকার অন্যতম উপদেষ্টা আর আমি ছিলাম বাংলাদেশ প্রতিনিধি। 


যাহোক। আমার তুমি’ বই  হুমায়ূন আহমেদ আর ইমদাদুল হক মিলনকে উৎসর্গ করেছি। হুমায়ূন ভাইও অমানুষ’ আমাকে উৎসর্গ করেছেন। তাঁর আমার আছে জল’ এবং সবাই গেছে বনে’ বাংলাদেশ বেতারে নাট্যরূপ দিয়েছি। বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা হয় আমাদের। ১৯৮৫ সালের একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ আড্ডার কথা আজ খুব মনে পড়ছে। এইসব দিনরাত্রি’ ধারাবাহিক নাটকের প্রথম আড্ডালোচনা হয় কবি আতাহার খানের শ্যামলীস্থ চার তলা বাসায়। সেই দিন হুমায়ূন ভাই ভারসাম্য বিষয়ক অদ্ভুত এক বাজি দিলেন-যদি কেউ সমস্ত শরীর দেয়ালে ঠেকিয়ে দেয়ালের সাথে লাগানো পা তুলে বিপরীত এক পায়ে দাঁড়াতে পারে, নাটকের প্রথম সম্মানী তাকে দিয়ে দিবেন। সেদিন আমরা কেউ সেই বাজিতে জিততে পারিনি!

এরকম অনেক মজার এবং মধুর স্মৃতি আছে তাঁর সাথে। সেই সাথে তিক্ত স্মৃতিও আছে। যে কারণে তাঁর সাথে সম্পর্কে ফাটল ধরে এবং দূরত্ব তৈরি হয়। শুধু তা-ই নয়; এক পর্যায়ে আমাকে উৎসর্গ করা অমানুষ’ থেকে বাদ দেন। 

এক সকালে হুমায়ূন ভাই বললেন, ‘দুলাল, দুপুরে স্টেডিয়ামে আসো। এক সাথে খাবো। যথারীতি গেলাম। লাঞ্চ করতে করতে বললেন, ইনকিলাব ভবনে যাবো। আতাহারকে এই গল্পটা দেবো-পুর্ণিমার জন্য। চলো

আমি তো অবাক! বললাম, “আপনি, মওলানা মান্নানের কাগজে লিখবেন? আপনার বাবাকে না মুক্তিযুদ্ধের সময় ওরা হত্যা করেছে! আপনি না একজন শহীদের সন্তান! আপনি সৌরভ, আগুনের পরশমণি, ১৯৭১এর মতো উপন্যাস লিখেছেন!

রেগে গিয়ে বললেন- আমার পাঠক, পয়সা এবং পৃষ্ঠপোষকতা দরকার

হুমায়ুন ভাই সমালোচনা সহ্য করতে পারতেন না। ভীষণ বিরক্ত হলেন, রেগে গেলেন। ভাত খাওয়া শেষ না করেই হাত ধুয়ে বিল দিয়ে হন হন করে চলে গেলেন। আমি বোকার মতো বসে রইলাম

তখন আমি কাজ করি জব্বার (বর্তমানে মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার) ভাইয়ের সাপ্তাহিক ঢাকার চিঠিতে। জব্বার ভাই আর হুমায়ূন ভাই একই এলাকার মানুষ এবং তারা পরস্পরের বন্ধুও বটে। ঘটনা শোনে জব্বার ভাই হাসলেন এবং বললেনআমার পাঠক, পয়সা এবং পৃষ্ঠপোষকতা দরকার… এই শিরোনামে ঢাকার চিঠিতে আগামী সংখ্যার কভার স্টোরি করে দাও

যথারীতি তাই হলো এবং হুমায়ূন ভাই আমাকে মনে মনে ব্লক করে দিলেন। দীর্ঘকাল পর তাঁর সেই অভিমান ভেঙ্গেছিলো নিউ ইয়র্কের মুক্তধারার বইমেলায়। অনুষ্ঠানে এক পর্যায়ে শাওন মঞ্চে গান গাইছেন। হুমায়ূন ভাই ছেলেকে কাধে নিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছেন। আর আমাকে ডেকে নিয়ে কথা বললেন। প্রশ্ন করলেন-কেনো কানাডায় চলে গেলে? দেশে গেলে ধানমন্ডির বাসায় যাবার আমন্ত্রণ জানালেন। ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন এক বুড়ো চাচা মিয়া এসে বললেন-স্যার, আপনার নাতি নাকি?

হুমায়ূন ভাই বল্লেন, না। আমার পুত্র!

আমি বললাম, আপনি কি এখনো আমার উপর রেগে আছেন! তিনি আমাকে স্নেহের অনুরাগে বাহু বন্ধনে জড়িয়ে বললেন- না রে না। ঢাকায় গেলে বাসায় এসো

২০০৯-এ ঢাকায় গিয়ে তাঁকে ফোন করতেই বললেন, `চলে আসো। চলে আসো। আড্ডা দেবো`। গেলাম। রোজার দিন। ধানমন্ডির বাসায় গিয়ে দেখি, ড্রইংরুম ভর্তি লোকজন, লেখক-সাংবাদিক, প্রকাশক। তিনি পাটি বিছিয়ে আস পেতে আসর জমিয়েছেনআড্ডা দিচ্ছেন। আমিও যোগ দিলাম সেই মজলিসে

 

হাসপাতালের বিছানায় হুমায়ূন আহমেদ, ছবিঃ লেখক 

হুমায়ূন ভাইয়ের জীবন্ত অবস্থায় শেষ তোলা ছবিটাও আমার। একটু খুলেই বলি। নিউ ইর্য়ক থেকে কবি শহীদ কাদরী ফোন করে জানতে চাইলেন, মুক্তধারার বইমেলায় যাচ্ছি কিনা? আমি বললাম- না, শহীদ ভাই, যাবোনাকবি শহীদ কাদরী নরম সুরে বললেন, ‘চইল্যা আসো। দেখা হবে, আড্ডা হবে। আমি বললাম, ‘গেলে ভালোই হতো। আপনার সাথেও দেখা হতো,হুমায়ূন ভাইকেও দেখতে পারতাম। তা ছাড়া তাঁর আঁকা চিত্র প্রদর্শণীও দেখার ইচ্ছে আছে। এবার জোরালো কন্ঠে বললেন- মিঞা, চইল্যা আসো। মাজহারও বললেন, 'দুলাল ভাই, চলে আসুন'

গ্রিহায়ন্ডে টিকিট কেটে টরন্টো থেকে ২৮ জুলাই ২০১২ চলে গেলাম নিউ ইর্য়কে। উঠলাম দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি সাহেদুল ইসলামের বাসায়। রাতটা পাড়ি দিয়েই সকালে পাতাল ট্রেনে উঠে ছুটে গেলাম ম্যানহাটনের ১ এভিনিউয়ের ২৮ ষ্ট্রিটের বিশ্ব বিখ্যাত ক্যান্সার হাসপাতাল বেলভ্যুতে। রিসিপশনে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ’ বলতেই একজন দাঁড়িওয়ালা বাঙালি ভদ্রলোক বললেন, এদিকে আসুন। তিনি ভিজিটর পাশ দিয়ে চমৎকার ভাবে বুঝিয়ে দিলেন কি ভাবে কোথায় যাবো। প্রায়ই বন্ধু মাজরুল ইসলামকে ফোন করে খোঁজ-খবর নিতাম। তখন ঠিকানাও নিয়ে নিয়েছিলাম। সেই মোতাবেক 10W43তে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি, শাওন ভাবী হাসপাতালের জুনিয়র এক ডাক্তারের দেয়া কাগজপত্রে সই করছেন। ভাবীর মুখটা খুবই মলিন। টুকটাক কথার পর তিনি চলে গেলেন বাইরের ওয়েটিং রুমে। হুমায়ূন ভাই আইসিইউতে শাদা বিছানায় শুয়ে আছেন। চাঁদরটা পায়ে জড়ানো। খালি গা। গায়ের রংটা কালচে। মুখটা সামান্য ফোলা ও ফ্যাকাশে, খোঁচা খোঁচা দাড়ি। আমার দেখা হুমায়ূন আহমেদের সাথে হাসপাতালের এই তার আর নলে আটকানো, ঘুম পাড়ানো হুমায়ূন আহমেদের মিল নেই। মনে হচ্ছে, বিশাল মাপের লেখকটা এতো ছোটখাটো হয়ে গেছেন! একেবারে অচেনা লাগছে। অসংখ্য বিদ্যুতের জটিল তারের মতো নানা ধরনের টিউব-পাইপ দিয়ে যেনো সারা শরীরে বাঁধা। ঝুলছে সেলাইন। পাশে অক্সিজেনের নল। নাকে-মুখে পাইপ, বুকে-পিঠে টিউব, শরীর জুড়ে টিউব-পাইপ জড়ানো হুমায়ূন আহমেদ; নাকি অন্য কেউ? আর তার পাশে অত্যাধুনিক মেডিক্যালের সক্রিয় যন্ত্রপাতি। হুমায়ূন আহমেদ অচেতন আর যন্ত্রপাতিগুলো সচেতন। সার্বক্ষণিক মনিটর করছে। উঠানামা করছে মিটারের দাগগুলো। জ্বলছে লাল-নীল-হলুদ বাতি

আমি নার্সের অনুমতি চাইলাম। তিনি অনুমতি দিয়ে বললেন, ইনটেনসিভ কেয়ার থেকে বেরিয়েই যেনো হাত-মুখভালো ভাবে ধুয়ে নিই। কারণ ইনটেনসিভ কেয়ারে মারাত্মক ভাইরাস আছে

আমি হাতে গ্লাফস, মুখে মাক্স, সারা গায়ে হালকা ব্লু গাউন পরে কাঁচে ঘেরা ঘরে ঢুকালাম। ঢুকে সংজ্ঞাহীন নাকি ঘুমন্ত হুমায়ূন আহমেদকে দেখে জীবন্ত হুমায়ূন আহমেদকে মনে পড়লো। 

ছবি তোলা নিষেধ। আর তাঁর পরিবার থেকেও বিধ্বস্থ হুমায়ূন আহমেদকে উপস্থাপন করতে চান না। তবু এক ফাঁকে পুরনো মোবাইল দিয়ে দ্রুত কয়েকটি ক্লিক করে নিলাম

হুমায়ূন আহমেদের সাথে পরিবারসহ লেখক 


লেখকঃ কবি ও প্রাবন্ধিক। 

Post a Comment

0 Comments